1. zobairahmed461@gmail.com : Zobair : Zobair Ahammad
  2. adrienne.edmonds@banknews.online : adrienneedmonds :
  3. annette.farber@ukbanksnews.club : annettefarber :
  4. steeseejep2235@inbox.ru : bobbye34t0314102 :
  5. celina_marchant44@ukbanksnews.club : celinamarchant5 :
  6. sk.sehd.gn.l7@gmail.com : charitygrattan :
  7. chebotarenko.2022@mail.ru : dorastrode5 :
  8. padsveva3337@bk.ru : janidqm31288238 :
  9. mahmudCBF@gmail.com : Mahmudul Hasan : Mahmudul Hasan
  10. marti_vaughan@banknews.live : martivaughan6 :
  11. randi-blythe78@mobile-ru.info : randiblythe :
  12. incolanona1190@mail.ru : sibyl83l32 :
  13. harmony@bestdrones.store : velmap38871998 :
আমার সেন্ট মার্টিন সফরনামা: প্রথম পর্ব
বৃহস্পতিবার, ২২ জুলাই ২০২১, ১১:১১ পূর্বাহ্ন

আমার সেন্ট মার্টিন সফরনামা: প্রথম পর্ব

সাইফুল ইসলাম রুবাইয়াৎ
  • আপডেট সময় : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২০
  • ৩৮৭ বার পড়া হয়েছে
সেন্টমার্টিন দ্বীপ; Image Source: tourrom.com

১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও কক্সবাজার সফর করলেও সেন্ট মার্টিন যাওয়া হয়নি। গত মাসে ছোট ভাই সপরিবারে কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিন সফর করলে, আমারও সেন্ট মার্টিন সফরের সাধ জাগে। এ জাতীয় লম্বা সফরের আগে কিছু বিষয় নিশ্চিত না হলে, আমার সফর উপভোগ্য হয় না। যেমন-

১। সাথীরা সমমনা না হলে, সফরের গোটা আনন্দই ফিকে হয়ে যায়!

২। বিলাসবহুল হিনো বাস বাহন হলে, এ-টু (A-2) সিট আমার জন্যে বিনোদিয়া।

৩। সাথীরা তাদের পরিবার সঙ্গে নেবেন না। নইলে, তারা তো পরিবার নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। আমাকে সময় দেবে কতোটুকুইবা? … ওতে আমার পোষাবে না।

৪। সফর রাতে হলে ভালো।

 

মহানবী (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) ফরমান: তোমরা রাতে সফর করো। কেননা, রাতে ভূমি সংকুচিত করে দেয়া হয় (আবু দাউদ)। তিনি আরো ফরমান: আল্লাহ্ তিন রকম লোককে ভালোবাসেন – যাদের অন্যতম হচ্ছে, একটি কাফেলা রাতভর সফর করলো। সফর শেষে তাদের কাছে ঘুমকে সবচেয়ে শ্রেয় মনে হলে, তারা (বাহন থেকে) নেমে (বালিশে) মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো। আর তখন তাদের কেউ আমার প্রশংসা করলো এবং আমার আয়াতগুলো তেলাওয়াত করলো … (আবু দাউদ, তিরমিজী, নাসাঈ, ইবনে খুঝাইমা, ইবনে হিব্বান ও হাকীম)। তাছাড়া, নৈশ-সফরের মজাই আলাদা। বিশেষ করে, যখন বাসের ভেতরের লাইট অফ করে দেয়া হয় এবং চালক বেপরোয়াভাবে বাস চালাতে থাকে। এতে অনেকে ভয় পেলেও বা চালককে সতর্ক করলেও আমি বরাবরই এটা উপভোগ করি।

 

যাহোক, গত মাসের ১৭ তারিখ (ডিসেম্বর ২০১৬) থেকে সেন্ট মার্টিন সফরের সঙ্গী খুঁজতে লাগলাম। প্রথমে শ্রদ্ধেয় মুন্সী গিয়াস ভাইকে নক করলে এবং তিনি মাসের শেষের দিকে যাবেন বললে, আশাবাদী হলাম। এরপর কয়েকজন এফবি-ফ্রেন্ডকে অফার দিয়ে হতাশ হলাম! তারপর দু’জন স্কুল-ফ্রেন্ডকে প্রস্তাব দিলে, ওরা আগে একবার গিয়ে ঘুরে আসায় প্রত্যাখ্যাত হলাম। অতঃপর দু’জন পীর ভাইকে রিং করেও নিরাশ হলাম। একজনের অর্থ-সমস্যা; আরেকজন ইতোমধ্যে তিনবার বেড়িয়ে এসেছে। অবশেষে আমার একজন কোর্স-সহপাঠী দেওয়ান আব্দুশ শুকুর সাইমুমকে সফর-সঙ্গী হিসেবে পেয়ে গেলাম। দু’বার পিছিয়ে এ মাসের ৫ তারিখের (জানুয়ারী ২০১৭) রাত চূড়ান্ত হলো। প্রথমে সরাসরি টেকনাফ যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দোহাজারীতে ছাত্রসেনার একটি অনুষ্ঠানে গিয়াস ভাই মেহমান হওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো যে, আগে সেখানে যেতে হবে। এরপর ওখান থেকে টেকনাফ হয়ে সেন্ট মার্টিন যাবো। আমি একটু বিরক্ত হলাম। তাঁকে ঐ অনুষ্ঠান এড়িয়ে যেতে অনুরোধ করলাম। কিন্তু লাভ হলো না।

 

ছবির বাম থেকে, সাইফুল ইসলাম রুবাইয়াৎ, আব্দুশ শুকুর সাইমুম এবং মুন্সী গিয়াস উদ্দিন।

 

সাইমুম বললো যে, ওর সিট আমার ও জানালার পাশে হতে হবে। আর বাসের সামনের বিশাল গ্লাস ভেদ করে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ীগুলোর হেড লাইটের আলো চোখে লাগে বলে গিয়াস ভাই প্রথম সারির সিট পছন্দ করেন না। সবার মন রক্ষা করা কঠিন। আমাদের তিনজনকে পাশাপাশি বসতেই হবে। আড্ডা দিতে দিতে মজা করতে করতে যাবো কিনা। তাই, আমার এ-টু সিট অক্ষুন্ন রেখে আমার বায়ের এ-ওয়ান সিটটি সাইমুমের এবং ডানের এ-থ্রি সিটটি গিয়াস ভাইয়ের জন্যে নেবো ভাবলাম। কাঙ্খিত সিট পেতে হলে, কয়েকদিন আগেই টিকেট করতে হয়। তাই, ২ তারিখে ফকিরাপুলের এস আলমের কাউন্টারে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সিট পেয়ে টিকেট কেটে ফেললাম। বাস ছাড়ার নির্ধারিত সময় ৫ তারিখ রাত ১১:১৫। সাইমুমের বায়ে জানালা ও ডানে আমি। আর আমার ডানে গিয়াস ভাই। চালকের পেছনে থাকায় ভাবলাম যে, তাঁর চোখে বিপরীত দিকের আলো কম লাগবে।

এস আলম বাস

সাথী দু’জনকেই আমি ভালোভাবে চিনলেও এর আগে তাদের পরিচয় হয়নি। দাম্পত্য-জীবনে সুখী তথা ভাগ্যবান হলেন, গিয়াস ভাই। পক্ষান্তরে, সাইমুম ঠিক এর বিপরীত! স্ত্রী এমবিবিএস ডাক্তার এবং দু’ কন্যা সন্তানের বাবা হয়েও সে দুনিয়ার চরম অসুখী তথা হতভাগাদের একজন! সেন্ট মার্টিনে যাওয়া হচ্ছে, গিয়াস ভাইয়ের বাণিজ্যিক কারণে; আমার বিনোদন পেতে; আর সাইমুমের ক্ষণিক-সুখের লাগি।

 

আমি পুরো সুস্থ ছিলাম না। ক-দিন ধরেই জন্ডিসের আলামত অনুভব করছিলাম। কিন্তু মনোবল এসব পরোয়া করলো না। শেষে চিকিৎসকের পরামর্শে ডায়াগনসিস করিয়ে সেই মোতাবেক দাওয়াই নিয়ে নির্ধারিত তারিখে নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় দেড় ঘন্টা আগেই এস আলমের কাউন্টারে হাজির হলাম। পেটের অবস্থা ভালো না থাকায় বাসা থেকে সামান্য নাস্তা খেয়েছিলাম। প্রায় সোয়া ঘন্টা পর গিয়াস ভাই এলেন; এর কিছুক্ষণ পর সাইমুম। দু’জনকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। শুরু হলো আলাপচারিতা। দু’জনকেই জানি বলে আমি কথা কম বলে, তাদেরকে আলাপের বেশি সুযোগ দিলাম যেনো ধীরে ধীরে তারা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। আমি ও সাইমুম একটি করে ছোট ট্রাভেল ব্যাগ নিয়েছি। আর গিয়াস ভাই সুন্দর একটি লাগেজ নিয়েছেন। কিন্তু সিডিউল টাইম চলে গেলেও গাড়ীর খবর নেই! শুনলাম পথে মারাত্মক যানজট! তাই দেরি হবে। কিন্তু আমার যে তর সইছে না! অবশেষে ১২টা ১০-এ বাস এলো; সবাই চড়ে বসলাম; ১২টা ১৮-তে রওয়ানা দিলাম। গিয়াস ভাইয়ের সিটের সামনে একটি গ্রিল থাকায় তাঁর চোখে বিপরীত দিকের আলো কম লাগবে ভেবে ভালো লাগলো। একজন সুখী ও আরেকজন অসুখী মানুষ নিয়ে আমার সফর শুরু হলো। এটি আমাদের তিনজনেরই প্রথম সেন্ট মার্টিন যাত্রা।

 

যাত্রাবাড়ী পার হয়ে আমাদের বাস জোরসে ছুটে চললো। সঙ্গী দু’জনের সঙ্গে গল্প করছি; কিছুক্ষণ পরপর সিটের পেছনটা প্রয়োজন মতো নামাচ্ছি ও উঠাচ্ছি। তবে, পুরো সুস্থ না থাকায় যতোটা গল্প করবো ভেবেছিলাম – ততোটা পারলাম না। শরীর মাঝে মাঝে অবসন্ন হয়ে আসছিলো। তখন একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছিলাম। এক সময়ে দেখলাম যে, সাইমুম ওর সিটের পেছনটা নামিয়ে গভীরভাবে ঘুমাচ্ছে। গিয়াস ভাই ও আমি কিছুক্ষণ ঘুমাচ্ছি; আবার জেগে কথা বলছি। কুমিল্লার কানন লেক্স রিসোর্টে যাত্রাবিরতি হলে, আমরা তিনজন নেমে ফ্রেশ হয়ে সামান্য কিছু খেয়ে নিলাম। গল্প করতে খুবই ভালো লাগছে। আমি পুরো সুস্থ থাকলে, আরও জমতো। একটু পরে বাস আবার আমাদের নিয়ে গন্তব্যে দ্রুত ছুটে চললো। এ অবস্থায় প্রায়ই মা’র একটি কথা মনে পড়ে। তিনি গাড়ীতে চড়লে, গাড়ী যখন দ্রুত ছুটে চলতো – তখন তিনি প্রায়ই বলতেন: এ চলার যদি আর শেষ না হতো!

 

কর্ণফুলী সেতু; Image Source: bn.wikipedia.org

 

ভোরে কর্ণফুলী সেতুর উপর দিয়ে যাওয়ার সময়ে গিয়াস ভাইকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলাম যে, এটি কর্ণফুলী নদী কিনা। সেই ছোটবেলা থেকে ‘কর্ণফুলী’ শব্দটি শুনলে বা কোথাও লেখা দেখলে দু’টি গান আমার মনে পড়বেই। একটি হচ্ছে, “ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে, অভাগীনির দুঃখের কথা কবি বন্ধুরে।” গানটি ১৯৭৯ সালে আজিজুর রহমান পরিচালিত ‘সাম্পানওয়ালা’ চলচ্চিত্রে দেশের কিংবদন্তী অভিনেত্রী শাবানার ঠোঁটে গেয়েছেন চট্টগ্রামের কণ্ঠশিল্পী কান্তা নন্দী। গীতিকার ও সুরকার: সঞ্জিত আচার্য। কান্তা যেমনি তার অপূর্ব সুরেলা কণ্ঠে ও মর্মস্পর্শী ঢংয়ে গানটি গেয়েছেন – শাবানাও তেমনি তার অভিনয়ের ষোলো আনা কারিশমা দিয়ে গানটি ফুটিয়ে তুলেছেন। এ অসাধারণ গানটি যেনো নদীটির হৃদয়! শেফালী ঘোষও তার মুন্সিয়ানা দিয়ে গানটি গেয়েছেন। শাবানার নেপথ্যে কান্তার কণ্ঠে গানটি উপভোগ করতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন:

 


আরেকটি গান হলো, দেশের বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী শেফালী ঘোষের গাওয়া: “ছোড ছোড ঢেউ তুলি পানি, ছোড ছোড ঢেউ তুলি লুসাই পাহাড় উড়ুত্তুন নামিয়েরে জারগই কর্ণফুলী।” গীতিকার ও সুরকার: মলয় ঘোষ দস্তিদার। নদীটির তামাম সৌন্দর্য ও মাধুর্য যেনো এ অসামান্য শ্রুতিমধুর গানে ফুটে উঠেছে! শেফালী ঘোষ যে কতো বড় মাপের গায়িকা ছিলেন – তা বলে বোঝাতে পারবো না। আমার মতে, তিনি নিঃসন্দেহে রুনা লায়লা ও ফেরদৌসী রহমানের সমমানের শিল্পী ছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক পদক, বাংলা একাডেমি আজীবন সম্মাননা পদক, শিল্পকলা একাডেমী পদক ও মরণোত্তর একুশে পদক তিনি পেয়েছেন বটে। তবুও মনে হয়, তার যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। তাকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারও দেয়া উচিত ছিলো। কেউ কখনও চট্টগ্রামের সৌন্দর্য লিখতে বসলে, তাকে ছাড়া তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে! তিনি শুধু চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের মুকুটহীন সম্রাজ্ঞীই ছিলেন না, বরং বাংলাদেশের সংগীত রাজ্যের অন্যতমা রাজকন্যাও ছিলেন – যিনি তাঁর নিখুঁত, সাবলীল ও অনাবিল কণ্ঠে গাওয়া গানগুলোর মাঝে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন! তার গানগুলো শুনলে মনে হয় যেনো প্রকৃতি গান গাইছে! জানি না, তাঁর মতো গুণী শিল্পী এদেশের আর কখনও জন্মাবে কিনা। ঐ কালজয়ী গানটি তার কণ্ঠে শুনতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন:

 

কর্ণফুলী-নদী; Image Source: protidinersangbad.com

 

আমি নদীপ্রেমিক। শহরায়নের ধাক্কায় ঐতিহ্যবাহী কর্ণফুলী নদীর দৈন্যদশা দেখে খুবই ব্যথিত হলাম! ঢাকার বুড়িগঙ্গা বা নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার মতো কর্ণফুলীও তার ঐতিহ্য হারিয়ে শহরের বৃহৎ নালায় পরিণত হতে যাচ্ছে ভেবে আতঙ্কিত হলাম! সেতুর উপর থেকে সাম্পান নৌকা খুঁজে পেলাম না; যদিও ঐ রকম কিছু দেখলাম। কিন্তু সেগুলো ইঞ্জিনচালিত। ২৩ বছর আগে যখন চট্টগ্রাম এসেছিলাম – তখন সদরঘাটে গিয়ে সাম্পান নৌকায় চড়েছিলাম। আসলে, যান্ত্রিকতার এ যুগে পালের কিংবা বৈঠাচালিত নৌকা দেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে ইতিহাসে ঠাঁই নিয়েছে। সাম্পান নৌকা না পেয়ে দুধের সাধ ঘোলে মেটাতে আবারও শেফালী ঘোষের দ্বারস্থ হলাম। তার আরেকটি কলজয়ী গান রোমন্থন করলাম: “ওরে সাম্পানওয়ালা তুই আমারে করলি দিওয়ানা।” গীতিকার ও সুরকার: মোহন লাল দাশ। এটি ১৯৭০ সালে বিটিভিতে প্রচারিত তার প্রথম গান। এর দু’ বছর আগে তারই কণ্ঠে গানটি গ্রামোফোন রেকর্ডে প্রকাশিত হলে, চারিদিকে সাড়া পড়ে যায়। শুনতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন:

 

সকাল সোয়া ৭টার দিকে দোহাজারী পৌঁছে গেলাম। সেখানে ছাত্রসেনার কর্মী ইমন আমাদের ইন্তেজারে ছিলো। ও আমাদের একটি অটো রিকশায় করে ওদের বাড়ীতে নিয়ে গেলো। সেখানে ভালোভাবে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। ওদের বৈঠকখানাটি খুবই চমৎকার! ইমন আমাদের নাস্তা পরিবেশন করলো। গিয়াস ভাই একটু শুয়ে জিরিয়ে নিলেন; আমাকেও বললেন। কিন্তু বাসে যতোটা ঘুমিয়েছি – তাতে শুতে ইচ্ছা করলো না। তাই, আমি ও সাইমুম সোফায় বসেই জিরিয়ে নিলাম। ঐদিনের আহূত অনুষ্ঠানের অন্যতম আলোচক গিয়াস ভাই পুরো বিশ্রাম নিতে পারলেন না। তাঁর সঙ্গে ছাত্রসেনার ছেলেরা এসে সাক্ষাৎ করতে লাগলো; অনেকে মোবাইল ফোনেও যোগাযোগ করে যাচ্ছিলো। তবে, ফাঁক পেলেই আমি তার, সাইমুম ও ইমনের সঙ্গে আলাপ সেরে নিচ্ছিলাম।

 

ইমনদের বৈঠকখানায়


জুমার আজান হলে, আমরা মসজিদে চললাম। ইমনদের বাসা থেকে ১২/১৩ মিনিট হেঁটে গেলে, সাঙ্গু নদের পাড়েই মসজিদ। সেখানে নামাজ আদায় করে নদের কাছে গেলাম; পা ভেজালাম। ভেবেছিলাম এর পানি বুঝি লোনা। কিন্তু স্বাদ নিয়ে বুঝলাম, তা মিঠে। তখন নজরুলের এ প্রসিদ্ধ হামদটির প্রথম লাইন মনে পড়লো: “এই সুন্দর ফুল সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি/(খোদা) তোমার মেহেরবানী।” প্রখ্যাত গায়ক মরহুম আব্বাসউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে হামদটি শুনতে চাইলে, এখানে ক্লিক করুন:

 

সাঙ্গু নদ; Image Source: bn.wikipedia.org

 

সাঙ্গু নদটি খুবই চমৎকার। চট্টগ্রাম বিভাগের নদ-নদীগুলোর মাঝে এটিই দ্বিতীয় বৃহত্তম (সবচেয়ে বড় কর্ণফুলী)। অনেকে বলেন যে, এর আসল নাম নাকি শঙ্খ নদ; বিকৃত হয়ে সাঙ্গু নদ হয়েছে। তবে, এ ব্যাপারে সঠিক ইতিহাস এখনও অজানা। আমার জানা মতে, বাংলাদেশের ভেতরে যেসব নদ-নদীর উৎপত্তি ও সমাপ্তি ঘটেছে – সাঙ্গু নদ তাদের অন্যতম। বান্দরবন জেলার মদক এলাকার পাহাড়ে জন্ম নেয়া ১৭০ কিঃমিঃ লম্বা এ নদ বান্দরবন ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। দোহাজারীতে সবচেয়ে ভালো লেগেছে এ নদটি। দোহাজারী সাঙ্গু সেতুটিও নদের পাড় থেকে দেখা যাচ্ছিলো। যখন নদীর পাড় ধরে হাঁটছিলাম – তখন রবীন্দ্রনাথের এ জনপ্রিয় কবিতাটি বারবার মনে পড়ছিলো – যা ছোটবেলায় বহুবার পড়েছি: “আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে। পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,. দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।” যদিও এখন বৈশাখ মাস নয়; কিন্তু সাঙ্গু নদকে ঠিক এ কবিতাটির মতো মনে হলো! ‘ছাত্রসেনার অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাচ্ছে’ – ইমনের এ তাগাদায় তটে আর টিকতে পারলাম না বলে মনঃক্ষুন্ন হলাম! এর আগেই দুপুরের খাওয়া সারতে হবে। ঐ অনুষ্ঠানে যেতে একেবারেই ইচ্ছে করছিলো না।

 

সাঙ্গু নদ, দোহাজারীতে এটিই সবচেয়ে ভালো লেগেছে। দূরে দোহাজারী সাঙ্গু সেতু। ছবি- লেখক।

 

যাহোক, ইমনদের বাসায় ফিরে এসে দেখি খাবার-দাবারের বিশাল আয়োজন করা হয়েছে! রকমারি আইটেম! কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো আমার! সিদ্ধ ডিম ছাড়া সকল তরকারিতেই ধনেপাতা দেয়া হয়েছে! ধনেপাতা আমার জন্মের শত্রু! এর গন্ধ আমার কাছে একেবারেই অসহ্য! জোর করে খেতে গেলে, নির্ঘাত বমি করে দেবো। এ বস্তু খেতে না পারায় মা-বাবার কাছে বহুবার কথা শুনেছি। কেননা, আমাদের বিক্রমপুরের মানুষও ধনেপাতাপ্রেমী। শুধু আমিই ব্যতিক্রম! আজ পর্যন্ত আমি ছাড়া বিক্রমপুরের এমন আর কাউকে আমিও পাইনি – যার আমার মতো ধনেপাতায় অভক্তি! যে তরকারিতে তা থাকবে – সেটা আমার কাছে বিষতুল্য! তাই, আম্মা সব সময়ে আমার জন্যে তরকারি আলাদা করে তুলে রাখতেন। এমন কি, ধনেপাতাওয়ালা তরকারি কোনো চামুচ দিয়ে নেড়ে ভুলে না ধুয়ে তা দিয়ে আবার আমার তরকারি নাড়লেও খেতে বসলে, আমি ঠিকই টের পেয়ে যাই। আমার জন্ম ঢাকা মেডিকেলে। আব্বা-আম্মা প্রায়ই বলতেন: “তোকে মনে হয় হাসপাতালে কেউ বদলে দিয়েছে! নর্থ বেঙ্গলের কারো সন্তানের সঙ্গে তোর বদলা-বদলি হয়ে গেছে! নইলে, আমাদের চোদ্দগুষ্টির কেউই তোর মতো ধনেপাতা অপছন্দ করে না।” অবশ্য আমার আম্মারও এমনই একটি সমস্যা ছিলো। তিনি আবার আগরবাতির ধোঁয়া একদমই সহ্য করতে পারতেন না! বলতেন: ওতে নাকি তিনি মরা মানুষের গন্ধ পান! ধনেপাতার ঘ্রাণে আমার যে দশা হয় – আগরবাতির ধোঁয়ার গন্ধে তাঁরও তেমনই দশা হতো! যেমন মা – তেমন তাঁর ছেলে হয়েছে!

 

এখন কী করি? ইমনরা তো আর এসব বাতেনি খবর জানে না। সকালের নাস্তায় নুডুলসেও ধনেপাতা ছিলো। কিন্তু ঘ্রাণ প্রকট এবং পরিমাণ কম হওয়ায় কোনো মতে বেছে খেয়েছি। ইতোমধ্যে ঐ বাড়ীর মুরব্বী এসে পরিচিত হলেন। তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপ করলাম। এরপর সেনার কয়েকজন ছেলে মধ্যাহ্নভোজনে যোগ দিলো। ওরাও ঐ অনুষ্ঠানে শরীক হবে। আমি পড়লাম ফাঁপরে! গিয়াস ভাই বা সাইমুমকে বলে কোনো লাভ নেই। যা করার আমাকেই করতে হবে। পরিচিত বাসা হলে বলতাম একটি ডিম ভেজে দিতে। তা দিয়ে অনায়াসে পুরো ভাত খেয়ে উঠতে পারি। কিন্তু এখানে প্রথম এসে মেজবানদের বিরক্ত করাটা মোটেও ভদ্রতা হবে না। ভেবেছিলাম মুরগী ও চিংড়ি মাছে বুঝি ধনেপাতা নেই। কিন্তু কাছে এনে দেখলাম – তাতেও!

 

ভাত ও পোলাও দু’ই-ই ছিলো। ভাবছি, কোনটা খাবো? একেই পুরো সুস্থ নই; পেটের অবস্থাও বেশি সুবিধার নয়। কাজেই, পোলাও খেলে পেটের সমস্যা বাড়বে বৈকি। তার উপর সিদ্ধ ডিম তো আছেই। কিন্তু সবার আগে আমার প্রধান দুশমন ধনেপাতাকে মোকাবেলা করতেই হবে। তাই, পোলাও খাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিলাম। কেননা, পোলাওর ঘ্রাণে ধনেপাতার ঘ্রাণ কিছুটা হলেও লাঘব হবে। খেতে শুরু করলাম। সিদ্ধ ডিম খাচ্ছি; আর ওটার দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে মনে মনে গাইছি:

“পারি না সইতে, না পারি কইতে, তুমি কি কুয়াশা?

ধোঁয়া ধোঁয়া ধোঁয়া …

ধোঁয়া ধোঁয়া ধোঁয়া।

ও আঁখি পাখী খোঁজে কি বাসা …।”

এ পর্যন্ত এসেছি পরে কে যেনো আমার পাতে এক টুকরো মুরগী গোশত তুলে দিলো! আমি সেখান থেকে ধনেপাতা বেছে ফেলতে শুরু করলাম। একটু পরে আরেকজন চিংড়ি মাছও পাতে তুলে দিলো। সেখান থেকেও ঐ বস্তু বাছতে লাগলাম। তবে, কেউ যেনো খেয়াল করতে না পারে – সেদিকেও কড়া খেয়াল রাখলাম। আমার ধারণাই ঠিক। পোলাও বেছে নেয়ায় ধনেপাতা বেছে কোনো মতে মুরগীর গোশত ও চিংড়ি মাছ দিয়ে কোনো মতে খেয়ে উঠতে পারলাম। পোলাওয়ের খুশবু আমায় সহায়তা করেছে। ভাত হলে, কেলেঙ্কারি হতে পারতো। আল্লাহুতা’লা এ যাত্রায়ও আমায় বাঁচিয়ে দিলেন। তাঁর মেহেরবানির যেমনি কোনো শেষ নেই – তেমনি তাঁর কাছে শোকর করার সাধ্যও আমার নেই।

 

ধনেপাতা খেতে পারি না – সেটা আমার সমস্যা। কিন্তু ইমনদের মেহমানদারিতে কোনো ছেদ ছিলো না। ওরা আক্ষরিক অর্থেই ভদ্রলোক। খাওয়া-দাওয়া শেষে অনুষ্ঠানে যাওয়ার তাড়াহুড়া শুরু হলো। ওটা এড়িয়ে সাঙ্গু নদের তীরে সময় কাটানোর অজুহাত খুঁজছিলাম। কিন্তু সুযোগ পেলাম না। এর আগেই গিয়াস ভাইয়ের অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে হলো! সাইমুম ছাত্রসেনার কোনো প্রোগ্রামে এই প্রথম বলে ওর মাঝে কিছুটা কৌতুহল লক্ষ্য করলাম। যাহোক, সবাই বাইছাসে চন্দনাইশ-সাতকানিয়া (আংশিক) থানা শাখার আয়োজিত ‘ক্যারিয়ার আড্ডা’ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দোহাজারীর রূপনগর কমিউনিটি সেন্টারে হেঁটে রওয়ানা হলাম – যা ইমনদের বাসা থেকে ১৫/১৬ মিনিটের পথ। আমি পুরো সুস্থ না থাকায় ক্লান্ত হয়ে বারবার পিছিয়ে পড়ছিলাম। (চলবে) 

 

 

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন এখানে… 

 

 


প্রিয় পাঠক, ‘দিন রাত্রি’তে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- ‘দিনরাত্রি’তে আপনিও লিখুন

লেখাটি শেয়ার করুন 

এই বিভাগের আরো লেখা

Useful Links

Thanks

© All rights reserved 2020 By  DinRatri.net

Theme Customized BY LatestNews